Dhaka , সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বরুড়ায় পুকুরের পানিতে নিভে গেল ছোট্ট ফরাদের জীবনপ্রদীপ গোপালনগরে মধ্যরাতে মুখোশধারী ডাকাতির হানা: স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ লুটপাট ২০১১ সালের রায়: যে রায়ে সূচিত হয়েছিল শেখ হাসিনার পতনের পথচলা হানিফ এগ্রো ফার্মের উদ্যোগে বরুড়ায় ফাইনাল ফুটবল ম্যাচ বরুড়ায় জামায়েত ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর মতবিনিময় দৈনিক বরুড়ার কন্ঠ প্রধান কার্যালয় উদ্বোধন আবু নাছের ইয়াহিয়ার তৃতীয় জানাযা বরুড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে স্বপ্নের গাউন পেয়ে উচ্ছ্বসিত বরুড়ার লিটল এঞ্জেল স্কুল সরকারি প্রতিষ্ঠান সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকবে, প্রতিশোধ না নেওয়ার ঘোষণা বাংলাদেশের রিক্তা আক্তার বানু বিবিসির ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায়
খোশবাস বার্তা

২০১১ সালের রায়: যে রায়ে সূচিত হয়েছিল শেখ হাসিনার পতনের পথচলা

  • জয়নাল মাযহারী
  • প্রকাশিতঃ ১২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
  • ২৫৩ বার পঠিত

২০১১ সালের একটি ঐতিহাসিক রায়—প্রথমদৃষ্টিতে যা মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এক রাজনৈতিক বিজয়, কিন্তু সময়ের স্রোতে তা-ই হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের পতনগাথা ও শেখ হাসিনার একচ্ছত্র শাসনের পরিসমাপ্তির কেন্দ্রবিন্দু।

এই রায়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যে ঘটে ভয়াবহ ছন্দপতন। নির্বাচন হারায় নিরপেক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রে নামে অন্ধকারের ছায়া। দীর্ঘ একদলীয় শাসনের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে এক সময় শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হয় জনরোষের মুখে।

১৩তম সংশোধনী ও কেয়ারটেকার সরকারের প্রেক্ষাপট

২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় জনগণের প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে ওঠে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা।
কিন্তু ২০১১ সালে, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হক এর এক যুগান্তকারী রায়ে এই ব্যবস্থাকে ঘোষণা করা হয় অসাংবিধানিক।

রায়ের মূল ভিত্তি ছিল:
একটি অনির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার রাখে না—যা সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।

কিন্তু বাস্তবে এই রায়ের ফলাফল হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ।
এটি ধ্বংস করে দেয় একটি কার্যকর রাজনৈতিক ভারসাম্য, এবং খুলে দেয় শেখ হাসিনার জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতার দরজা।

রাজনৈতিক সুবিধা থেকে গণতন্ত্রের ক্ষয়

এই রায়ের পর:

বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা তা হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন।

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে—প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন এমনকি সংবাদমাধ্যম—দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে শাসকগোষ্ঠী।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই রায় হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার নিয়ামক।

জুলাই ২০২৪: শিক্ষার্থীদের জাগরণ ও একনায়ক পতনের সূচনা

দীর্ঘ এক দশকের নিপীড়ন ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ক্ষোভ জমতে জমতে অবশেষে তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে।

‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত এই আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে রূপ নেয় গণবিপ্লবে।
দমননীতি, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনাগুলো আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার অবিরাম বিক্ষোভের সামনে শেখ হাসিনার সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: একঘরে হয়ে পড়া বাংলাদেশ

আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
বিষণ্ণ প্রতিক্রিয়ায় আসে:

ভিসা নিষেধাজ্ঞা,

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ,

সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা।

ধীরে ধীরে শেখ হাসিনা বিশ্বের কাছে এক দক্ষিণ এশীয় স্বৈরশাসকের প্রতিচ্ছবি হিসেবে চিহ্নিত হন।

শেষ দৃশ্য: শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও বিচারের মুখোমুখি হওয়া

২০২৪ সালের আগস্টে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের চাপে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন।
বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন।

বাংলাদেশে বর্তমানে গঠিত হয়েছে কেয়ারটেকারধর্মী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—যার মাধ্যমে দেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজছে।

ইতিহাস বিচার করবে একদিন

আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ২০১১ সালের সেই রায়ের মূল্যায়ন করলে প্রতীয়মান হয়, যদি সে রায় না হতো, বাংলাদেশ হয়তো আরও কিছু সময় বহুদলীয় গণতন্ত্রে টিকে থাকতে পারত।

কিন্তু খায়রুল হকের সেই রায় থেকেই জন্ম নেয়:

একচ্ছত্র শাসন,

ভোটবিহীন নির্বাচন,

প্রশাসনের দলীয়করণ।

এবং এক সময় সেই রায়ই হয়ে ওঠে শেখ হাসিনার পতনের প্রধান অনুঘটক।

“একটি ভুল রায় একটি শাসকের পতন ঘটাতে পারে—এবং একটি জাতির রাজনীতিকে বছরের পর বছর করে দিতে পারে পঙ্গু।”

 

 

 

বিশ্লেষক: জয়নাল মাযহারী
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট, কুমিল্লা
আইন গবেষক ও বিশ্লেষক

 

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় আপডেট

বরুড়ায় পুকুরের পানিতে নিভে গেল ছোট্ট ফরাদের জীবনপ্রদীপ

২০১১ সালের রায়: যে রায়ে সূচিত হয়েছিল শেখ হাসিনার পতনের পথচলা

প্রকাশিতঃ ১২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫

২০১১ সালের একটি ঐতিহাসিক রায়—প্রথমদৃষ্টিতে যা মনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এক রাজনৈতিক বিজয়, কিন্তু সময়ের স্রোতে তা-ই হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের পতনগাথা ও শেখ হাসিনার একচ্ছত্র শাসনের পরিসমাপ্তির কেন্দ্রবিন্দু।

এই রায়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যে ঘটে ভয়াবহ ছন্দপতন। নির্বাচন হারায় নিরপেক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রে নামে অন্ধকারের ছায়া। দীর্ঘ একদলীয় শাসনের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে এক সময় শেখ হাসিনাকে বিদায় নিতে হয় জনরোষের মুখে।

১৩তম সংশোধনী ও কেয়ারটেকার সরকারের প্রেক্ষাপট

২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় জনগণের প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে ওঠে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা।
কিন্তু ২০১১ সালে, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হক এর এক যুগান্তকারী রায়ে এই ব্যবস্থাকে ঘোষণা করা হয় অসাংবিধানিক।

রায়ের মূল ভিত্তি ছিল:
একটি অনির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার রাখে না—যা সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।

কিন্তু বাস্তবে এই রায়ের ফলাফল হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ।
এটি ধ্বংস করে দেয় একটি কার্যকর রাজনৈতিক ভারসাম্য, এবং খুলে দেয় শেখ হাসিনার জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতার দরজা।

রাজনৈতিক সুবিধা থেকে গণতন্ত্রের ক্ষয়

এই রায়ের পর:

বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা তা হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন।

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে—প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন এমনকি সংবাদমাধ্যম—দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে শাসকগোষ্ঠী।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই রায় হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের বদলে একদলীয় কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার নিয়ামক।

জুলাই ২০২৪: শিক্ষার্থীদের জাগরণ ও একনায়ক পতনের সূচনা

দীর্ঘ এক দশকের নিপীড়ন ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ক্ষোভ জমতে জমতে অবশেষে তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে।

‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত এই আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে রূপ নেয় গণবিপ্লবে।
দমননীতি, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনাগুলো আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার অবিরাম বিক্ষোভের সামনে শেখ হাসিনার সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: একঘরে হয়ে পড়া বাংলাদেশ

আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
বিষণ্ণ প্রতিক্রিয়ায় আসে:

ভিসা নিষেধাজ্ঞা,

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ,

সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা।

ধীরে ধীরে শেখ হাসিনা বিশ্বের কাছে এক দক্ষিণ এশীয় স্বৈরশাসকের প্রতিচ্ছবি হিসেবে চিহ্নিত হন।

শেষ দৃশ্য: শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও বিচারের মুখোমুখি হওয়া

২০২৪ সালের আগস্টে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের চাপে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন।
বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন।

বাংলাদেশে বর্তমানে গঠিত হয়েছে কেয়ারটেকারধর্মী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—যার মাধ্যমে দেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজছে।

ইতিহাস বিচার করবে একদিন

আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ২০১১ সালের সেই রায়ের মূল্যায়ন করলে প্রতীয়মান হয়, যদি সে রায় না হতো, বাংলাদেশ হয়তো আরও কিছু সময় বহুদলীয় গণতন্ত্রে টিকে থাকতে পারত।

কিন্তু খায়রুল হকের সেই রায় থেকেই জন্ম নেয়:

একচ্ছত্র শাসন,

ভোটবিহীন নির্বাচন,

প্রশাসনের দলীয়করণ।

এবং এক সময় সেই রায়ই হয়ে ওঠে শেখ হাসিনার পতনের প্রধান অনুঘটক।

“একটি ভুল রায় একটি শাসকের পতন ঘটাতে পারে—এবং একটি জাতির রাজনীতিকে বছরের পর বছর করে দিতে পারে পঙ্গু।”

 

 

 

বিশ্লেষক: জয়নাল মাযহারী
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট, কুমিল্লা
আইন গবেষক ও বিশ্লেষক